খবর ডেস্ক :
রাতের অতন্দ্র প্রহরী কুকুর। মানুষ যখন গভীর নিদ্রায় থাকে তখনও রাত জেগে মনিবের সম্পদ পাহারা দেয় এই বোবা প্রাণী। সম্প্রতি বরিশাল নগরজুড়ে কুকুরের একের পর এক মৃত্যু ভাবিয়ে তোলে নাগরিকদের। অবশেষে সামনে এলো কুকুরের মৃত্যুর রহস্য।
মূলত স্বাভাবিকভাবে নয়, নিরীহ এই প্রাণীগুলোকে বিষ খাইয়ে হত্যা করছে দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি বরিশাল নগরীর উত্তর জনপদ কাউনিয়া এলাকায় দুই দিনে ১৬টি কুকুর হত্যার পর সামনে আসে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা। এই খবরে ক্ষুব্ধ প্রাণী লাভাররা দোষিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন।
আর প্রশাসন বলছে, প্রাণী হত্যা মহাপাপ। লিখিত অভিযোগ পেলে যারাই এই হত্যার সঙ্গে জড়িত- তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
সরেজমিনে বরিশাল নগরীর কাউনিয়া ক্লাবরোডে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে মরে পড়ে আছে একের পর এক কুকুর। কোনটি বাচ্চা, আবার কোনটি বয়স্ক কুকুর। কিছু কুকুর রাস্তার পাশে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
জানা গেছে, করোনা মহামারির সময় থেকে ৬ বছর ধরে দেখভাল এবং খাবার খাওয়াচ্ছেন ক্লাব রোডের বাসিন্দা ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স, প্রাণী প্রেমী লিংকন দত্ত।
তিনি বলেন, “কাউনিয়া ক্লাব রোড এবং পার্শ্ববর্তী কাঠের পোল এলাকায় ৩০টির মত কুকুর রয়েছে। কুকুরগুলোকে গত ছয় বছর ধরে প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে আমিই খাবার দিয়ে আসছি। শীত এবং বর্ষায় ওদের থাকার জন্য আমার বাড়ির মধ্যে একটি টিনের সিড বানিয়ে দিয়েছি। ওদের চিকিৎসাও আমি করি। এগুলো কারোর ক্ষতি করেছেন- এমন অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আসেনি।”
লিংকন দত্ত বলেন, “কুকুরগুলো মৃত্যুর ঠিক তিন-চারদিন আগে একজন ব্যক্তি এসে কেক খাইয়ে গেছে। তার কাজে আমি প্রশংসাও করেছি। কিন্তু দুই দিন পর থেকেই দেখছি কুকুরগুলো নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে এবং একে একে মরে রাস্তার পাশে পড়ে থাকছে। দুই দিনে ক্লাব রোড এবং কাঠের পোল এলাকার দুটি মা কুকুরসহ ১৬টি কুকুর একে একে মারা গেছে। এখনো অন্তত ৮/১০টি কুকুর নিস্তেজ হয়ে ঝিমচ্ছে।”
লিংকন দত্তের ধারনা কেক দেওয়া ব্যক্তিই কেকের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করেছে কুকুরগুলোকে। এ বিষয়ে তিনি থানা এবং সিটি করপোরেশনে অভিযোগ দিবেন বলেও জানান।
লিংকন দত্তের মত একই অভিযোগ করেছেন, ক্লাব রোডের ভাড়াটিয়া বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বরিশাল শাখার উপ-পরিচালক বিপ্লবসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “প্রতিটি কুকুরই শান্ত স্বভাবের ছিল। কাউকে ক্ষতি করতো না। গভীর রাতে চোর বা সন্দেহজনক কাউকে দেখলে ক্ষুব্ধ হতো। সম্প্রতি এক ব্যক্তি কুকুরগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে কুকুরগুলো হত্যার পেছনে সেই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে।
শুধু কাউনিয়া ক্লাব রোড বা কাঠের পোল এলাকায় নয়, নগরীর ভাটিখানা, রূপাতলী এবং শহরের প্রাণকেন্দ্র সদর রোড এলাকাতেও বিষ প্রয়োগ করে নির্বিচারে রাস্তার কুকুর হত্যার অভিযোগ রয়েছে। রাতের ফাঁকা নগরীতে চুরি, ছিনতাই এবং অপরাধ সংগঠিত করতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কুকুরগুলো নির্বিচারে হত্যা করা হতে পারে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কুকুর হত্যার ঘটনা দুঃখজনক উল্লেখ্য করে বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের ভেটেরেনারি সার্জন ডা. রবিউল ইসলাম বলেন, রাস্তার কুকুর পরিবেশের জন্য অনেক উপকারী। এগুলো না থাকলে মানুষকে অনেক বেগ পেতে হতো। তাছাড়া কুকুর নিধন রোধে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। এজন্য গত বছরের জুনে সিটি করপোরেশন থেকে ৪০ হাজারের বেশি কুকুরকে আমরা ভ্যাকসিন দিয়েছি।
তিনি বলেন, “কুকুরগুলোকে কারা হত্যা করেছে সেটা চিহ্নিত করা দরকার। এই ঘটনায় কুকুরের মালিক বা কারোর কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কুকুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।”
নগরজুড়ে নিরীহ প্রাণী কুকুর হত্যার ঘটনাটি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “প্রাণী হত্যা মহাপাপ। তবে ইতোপূর্বে কুকুর হত্যার অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র : দেশকাল নিউজ





