খবর ডেস্ক :
সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি। বাকি তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও একটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
এখন কথা উঠেছে, তিনটি আসন বিএনপির হাতছাড়া হলো কেন? জামায়াতের ভোট ব্যাপকভাবে বাড়ল কেন? কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগের অবর্তমানে নিজের শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে জামায়াত। আবার কেউ বলছেন, বিগত ১৭ বছর বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে সুবিধাজনক জায়গায় থাকতে না পারলেও জামায়াত গোপনে তাদের রাজনীতি চালিয়ে গেছে।
ফলে সাংগঠনিকভাবে তাদের দুর্বলতা ছিল না। সেই সঙ্গে ধর্মীয় আদর্শ ও আবেগ কাজে লাগিয়েছে জামায়াত।
অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই—১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর-১ আসনে জিতেছিলেন জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এর আগে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বরিশালে জামায়াতের কোনো আসন ছিল না।
২০০৮ সালের নির্বাচনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পরাজিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী একেএমএ আউয়ালের কাছে। পরের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আসনটি পতিত আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণেই ছিল।
এবার আসনটি আবারও জামায়াতের হাতে চলে গেল। এ আসনে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সাঈদী-পুত্র মাসুদ সাঈদী।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের আলমগীর হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ১০৫ ভোট।
আশ্চর্যজনকভাবে বরিশাল বিভাগে আরও একটি আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রথমবারের মতো বিজয়ী হয়েছেন। বাউফল উপজেলা নিয়ে গড়ে ওঠা পটুয়াখালী-২ সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে ধরা হয়। কারণ ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে মাত্র দুইবার বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, পক্ষান্তরে ৬ বার আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ. স. ম. ফিরোজ নির্বাচিত হয়েছেন।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ৯৮ হাজার ৪৩৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের শহিদুল আলম তালুকদার পেয়েছেন ৭২ হাজার ১৯১ ভোট।
এদিকে মাত্র দুটি আসনে বিজয়ী হলেও বিএনপির ঘাঁটি খ্যাত বরিশাল বিভাগের প্রায় প্রতিটি আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জয়-পরাজয়ের ভোটের ব্যবধান কমেছে। এমনকি বিগত সময়ের তুলনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশেরও ভোট বৃদ্ধি পেয়েছে বিভাগজুড়ে। ভোট বৃদ্ধির এ খেলায় বরিশাল বিভাগে একটি আসনও বাগিয়ে নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন দলটির মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. অলি উল্লাহ। তিনি ধানের শীষের নজরুল ইসলাম মোল্লাকে ৪ হাজার ১৭৫ ভোটে হারিয়েছেন।
বরিশাল জেলার ৫টি আসনের ফলাফলে দেখা গেছে, জামায়াতের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫২ ভোট। জামায়াতের কামরুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট।
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনে ১ লাখ ৪১ হাজার ৬২২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিএনপির সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। জামায়াতের আবদুল মন্নান পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৮২ ভোট।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়েছেন বিএনপির জয়নুল আবেদীন। জামায়াত জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে বিএনপির রাজীব আহসান পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট। জামায়াতের মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়েছেন বিএনপির আবুল হোসেন খান। জামায়াতের মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট।
অন্যদিকে পিরোজপুর-২ (কাউখালী-ভান্ডারিয়া-জিয়ানগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট। জামায়াত–সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।
বরগুনা-২ (পাথরঘাটা, বামনা ও তালতলী) আসনে বিএনপির মো. নূরুল ইসলাম মণি পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৪২৮ ভোট। জামায়াতের ডা. সুলতান আহমদ পেয়েছেন ৮৩ হাজার ১৫ ভোট।
ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির রফিকুল ইসলাম জামাল ৬২ হাজার ১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। জামায়াতের ড. ফয়জুল হক পেয়েছেন ৫৫ হাজার ১২০ ভোট।
ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট। জামায়াতের এস. এম. নেয়ামুল করিম পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট।
বিএনপির ঘাঁটি বরিশাল বিভাগে তিনটি আসন হাতছাড়া হওয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটের ব্যবধান কম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে বিএনপির ধানের শীষের নির্বাচিত প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ফলাফল প্রকাশের পরপরই গণমাধ্যমকে বলেন, চল্লিশ বছর ধরে এলাকায় কাজ করে নির্বাচনের ফলাফলে খুশি হতে পারিনি। কারণ আমি আশ্চর্য হয়েছি, আমার এলাকায় জামায়াতের এত ভোট কোথা থেকে এলো।
অনুভূতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কী আর বলব, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমরা বিজয়ী হয়েছি। জেলার সব সিট আমরা পেয়েছি।
বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান হীরা বলেন, বরিশাল বিভাগে বিএনপি ও জোটের সমর্থিত ১৮টি আসনে জয়লাভ বড় বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মাঝে ধানের শীষের সমর্থন বেশি, ফলে বিগত দিনেও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপিকে বিপুল ভোট পেতে দেখা গেছে এ অঞ্চলে।
তিনি বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মতো বড় দল আসতে পারেনি, ফলে তাদের সমর্থকরা এখানে বড় একটি ফ্যাক্টর ছিল। একাত্তরের চেতনাবিরোধীদের বাদ দিলে বিএনপি ছাড়া স্বাধীনতার সপক্ষের আর কোনো শক্তি এ নির্বাচনে মাঠে ছিল না, সেই হিসাবেও আওয়ামী ভোটাররা বিএনপিকে পছন্দ করেছে। আবার সংখ্যালঘু ভোটাররাও নিজেদের নিরাপদ রাখতে সরাসরি ইসলামিক দলগুলোকে সমর্থন না দিয়ে সার্বজনীন অবস্থানের কথা বিবেচনা করে বিএনপিকেই ভোট দিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অর্থাৎ চরমোনাইপন্থীদের ভোট আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন এক বাক্স নীতিতে একত্রে থাকলে বিএনপির কিছু আসনে জয় পেতে আরও বেগ পেতে হতো। যদিও তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টির পরিবর্তন হয়েছে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার যে প্রত্যয় তারেক রহমান ব্যক্ত করেছেন, তাতে জেন-জি ভোটারদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বিএনপি।
জামায়াতের ভোট বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের জোট গড়া-ভাঙাই মূল কারণ। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর সারা দেশে জামায়াত প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করতে পারেনি, গুপ্ত অবস্থায় থেকে বিএনপি জোটের ওপর ভর করে রাজনীতি করেছে। ফলে এবারে আলাদা হয়ে নির্বাচনে যাওয়ায় সেখানকার বেশ কিছু ভোট জামায়াতের পক্ষে চলে গেছে। একইভাবে সারা দেশে জামায়াত আলাদা হয়ে যাওয়ায় বর্তমান বিএনপি জোটের ভোট কমেছে।
জামায়াতের ভোট বেড়ে যাওয়ার পেছনে আরও দুটি কারণ তিনি উল্লেখ করেন। একটি হলো ৫ আগস্টের পর জামায়াত সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়েছে। অন্যটি হলো—বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করার পাশাপাশি কিছু নেতার দুষ্কর্মের কারণে বিএনপির ভোট কমেছে।
তিনি মনে করেন, জামায়াতের কিছু কর্মকাণ্ড সমালোচিত না হলে ভোট হয়তো আরও বেড়ে যেত। যেমন—নির্বাচনের আগে জামায়াত টাকা-পয়সা দিয়ে ভোট কিনতে গিয়ে সারা দেশে সমালোচনার মুখে পড়েছে। আবার সরকারে তাদের লোক ঢুকিয়ে কিছু মেকানিজম করার অপচেষ্টা করেছে। ভোট সেন্টার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোট কেনার বিষয়েও চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক উন্মেষ রায় বলেন, গত ১৭ বছরে বিএনপি সেইভাবে ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারেনি। সে কারণে তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও জয়ী হওয়ার প্রবল চেষ্টা ছিল। দলীয় প্রধানের নির্দেশনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রমগুলোও যুগোপযোগী ছিল। দল যাকে প্রার্থী করেছে, তার পক্ষেই সবাই জোটবদ্ধ হয়ে কাজও করেছে। এসব কারণেই বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয় পেয়েছে।
জামায়াতের ভোটের পরিসংখ্যান বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, মূলত বিএনপি-আওয়ামী লীগ—এরাই একে অপরের প্রধান বিরোধীদল হিসেবে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে বিভক্ত। সত্যি কথা বলতে, ভোটের প্যাটার্নে বিএনপির প্রধান বিরোধী দল না থাকলেও জামায়াত সেই জায়গা অর্জন করতে পেরেছে। জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে তারা (জামায়াত) বার্তা দিতে পেরেছে, নিজেদের নতুন হিসেবে তুলে ধরেছে। এছাড়া ধর্মীয় আদর্শের কথা বলতে পেরেছে, যা মানুষ গ্রহণও করেছে।
তিনি বলেন, এর বাইরে সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ও জামায়াতের জন্য ভালো হয়েছে। জামায়াত বিগত দিনে প্রকাশ্যে না থাকলেও গোপনে রাজনীতি চালিয়ে গেছে, যার প্রমাণ ভোটের মাঠে রেখেছে।
আর দক্ষিণাঞ্চলের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক দল। সবাই মিলে যদি এক বাক্সে ভোট আনতে পারত, তাহলে বিভাগে দুটি নয়, ৬-৭টি আসনে তাদের প্রার্থী বেরিয়ে যেত—বলে মত এই অধ্যাপকের।
সূত্র : বাংলানিউজ২৪






